আমার যাত্রা হল শুরু! মাস্টার্স এর! কিন্তু…।
আমি খুব একটা স্বস্তিপূর্ন অবস্থায় নেই যে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, এক গাল হাসি হেসে সবাইকে খবরটা জানাব কারন আমি ভীষনভাবে চিন্তিত কিভাবে শেষ করব এত কঠিন এক রোলার কোস্টারের ভ্রমন। ওয়ান্ডারল্যান্ড ভেঙ্গে ফেলল, ঐ রাস্তা দিয়ে যাবার সময় বার বার মনে পড়ে যায় আমার হনার্স জীবনের কথা। প্রতিদিন গুলশান-২ দিয়ে যাবার সময় ওয়ান্ডারল্যান্ড এর দিকে তাকিয়ে দেখতাম সেখানে ছোট ছোট বাচ্চারা তাদের বাবা মা’র সাথে কত আনন্দের সময় কাটাচ্ছে। আজ সেই বিধ্বস্ত ওয়ান্ডারল্যান্ড দেখে নিজের কথা মনে হচ্ছে। শুধু মাত্র দুটো পাখি অবশিষ্ট পড়ে আছে। মানুষের কোন কিছুই স্থায়ী নয়। সব কিছু এক দিন ভেঙ্গে চূর্নবিচূর্ন হয়ে যায়। যেমন আত্মবিশ্বাস, তেমন অহংকার! যত ভেবেছিলাম মাস্টার্সটা আরো দুই বছর পর করব সেখানে আমাকে জবরদস্তি করেই ভর্তি করাল বাবা। আমি ক্লাসে গেলাম, বাবা খুব খুশি। আমি ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরলাম, বাবা খুব তৃপ্ত। কিন্তু বাবা’র মেয়ে অসুখী। আমি কেন স্বস্তি পাচ্ছিনা আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা। আমার তো ভীষন আনন্দ হবার কথা। একই বিদ্যায়তন, সেই পরিচিত অধ্যাপকগনেরা এমনকি আমিও সেই একই মেয়ে তারপরও আমি খুশি হতে পারছিনা। জীবনের শেষ পড়াশোনা (যদি না বিদেশে যেয়ে আরেকটা মাস্টার্স এর সুজোগ আমার হয়)! মাঝে মাঝে জীবনে এমন অনেক সিদ্ধান্ত আমাদের বাধ্য হয়ে নিতে হয় যা একান্তই অন্যের সুখের ভান্ডার। যেই সিদ্ধান্তে নিজের কিছু থাকে না।

আমার প্রথম ক্লাস ছিল “The history of English Language” এর উপর। ভাষার এই সব ইতিহাস আমার মুখস্ত করতে হবে মনে পড়লেই হাত পা কাঁপছে। এমন না যে জীবনে প্রথমবার আমি ইতিহাসগুলো পড়ব। আগেও করেছি বেশ কিছু কোর্স ইতিহাসের। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমি জানিনা। এই জানিনা / বুঝিনা/ ধুর্ – শব্দগুলো এখন এত বেশি মামুলি হয়ে গেছে আমার জীবনে যে রাগও লাগেনা শব্দগুলো ব্যাবহার করতে। ক্লাস হয় আমাদের সন্ধ্যায়। ৬টা থেকে ৯টা! ক্লাসের সময়টা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। সারাদিন যার যা কাজ থাকে তা শেষ করে সাঁঝের বেলায় ক্লাস। অপরাহ্নের উচ্চতাপটাও থাকে না আবার একেবারে গভীর রাতও না। সেই সময় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরটাকে প্রচন্ড কল্পনাবিলাসী লাগে। মনে হয় কোন পাঁচতারা হোটেলে এসে পড়েছি। চারিদিকে আলো ঝলমল করে, কেমন যেন এক ধরনের আবেগজড়িত নীরবতা। শুধু মাত্র স্নাতকোত্তরের ছেলে মেয়েরাই এইদিক সেইদিক দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে বা ক্যাফেটেরিয়াতে ভীড় করছে। তাও তা হাতে গুনে কয়েকজন। সিঁড়িগুলোতেও কেও নেই। হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে ন্যাক এবং স্যাক বিল্ডিং এর মাঝে দিয়ে। কোন দিন স্নাতক এর সময়ও এমন কল্পনাময় লাগেনি।

সত্যি কথা বলতে গেলে আমরা যারা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা ছাত্রী ছিলাম, আমাদের গুরুত্ব এবং সন্মান সম্পূর্ন আলাদা। আমাদের কে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গ্রহন করা হয়েছে। চত্বরের যেখানেই নিজের আইডি কার্ডটা দেখাচ্ছি, সেখানেই এক অন্যরকমের শ্রদ্ধাবোধ আমরা পাচ্ছি। তাতে আমার গর্বের মাত্রা কয়েক ডিগ্রী বেড়ে গেছে। তারপরও আমি খুশি না। হতে পারে এর একটা কারন, আমি কোন ভাবেই নিজেকে মিলাতে পারছিনা। আমার সব বন্ধুরা কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। কেও কেও দেশের বাহিরে, কেও কেও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেও কেও আবার পাশ করে বের হয়ে যাবার সময় হচ্ছে। আমি জানিনা আমি কেন প্রতিনিয়ত তাদের খুঁজছি? জায়গায় জায়গায় কেন আমি প্রচ্ছায়া দেখতে পাচ্ছি? এমনকি কাল যেই ক্লাস রুমে আমরা প্রথম ক্লাসটা করলাম সেখানেও আমার খুব কাছের বন্ধুর সাথে প্রথম ক্লাস করেছিলাম। ফিরে এসেই তাকে জানালাম ব্যাপারটা। কোন এক জায়গায় আমার বন্ধুও খুব কষ্ট পাচ্ছে আমার স্ট্যাটাস আপডেট দেখে। কিন্তু কি করব, কিছু কিছু জিনিস যতক্ষন মনের মধ্যে কোন কারন ছাড়াই বিচরণ করে তাকে বের না করে দেয়া পর্যন্ত মানুষ নিশ্চলতা পায়না। আমি হয়ত মনের লড়াই এর সমাপ্তির জন্যই অন্যকে অজান্তে আহত করছি। তবে আর না। ব্লগে আজ এই বিষয়ে লিখতে পেরে অনেকটা হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে, অন্তত আমাকে কেও ভুল বুঝবে না যদি অজ্ঞাতসারে কাওকে আঘাত করে থাকি।

প্রথম ক্লাসটা আমার ভাল গেছে। তিন জন নতুন বন্ধু মিলে ক্লাস শেষে এক সাথে কিছু ছবি তুললাম এবং এক প্লেটে ফুচকা নিয়ে তিনজন শেয়ার করে খেলাম। সবাই মিলে এক প্লেটে খেলে নাকি স্নেহ-মমতা বাড়ে। প্রথমদিন তাই ফুচকা শেয়ার করে খাবার মজাই আলাদা ছিল! আরেকটা ব্যাপার খুব ভাললাগল। আমরা তিনজনই খুব সাজুগুজু করতে ভালবাসি। আমাদের সব কথার শেষে কিভাবে যেন সাজের ব্যাপারটা চলে আসে। আশা করি আমরা তিনজন এক সাথে পাশ করে বের হয়ে যেতে পারব। তারপর এক সাথে হবে আমাদের সমাবর্তন। অপেক্ষায় আছি শেষ করার। বারটা কোর্স, নিবন্ধন এবং সব শেষে উপস্থাপনা। দোয়া চাই সকলের।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছবি মাঝে মাঝে দিয়েছি। যারা আমাদের ক্যাম্পাস দেখেননি, ছবিগুলো তাদের জন্য।
আর যারা ইতিমধ্যে দেখে দেখে ক্লান্ত তাদের আরেকবার বলছি, আমার ক্যাম্পাস কিন্তু অনেক চমৎকার করে সাজানো! যদি ইচ্ছে করে একবার এসে আমাদের এডমিন বিল্ডিং দেখে যেতে পারেন। Till then সবাই পূর্ন মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করুন এবং আল্লাহ্র কাছে ধন্যবাদ জানান আপনাকে এত সুন্দর পরিবেশ দিয়েছে শিক্ষা অর্জনের। সবাই কিন্তু শিক্ষার সুজোগ পায়না। কেন পায়না তারই এক উদাহরণ নিয়ে হবে আমার পরবর্তি পোস্ট
!
বিদায়ের আগে একটা উদ্ধৃতি না দিয়ে পারলাম না…
Responsibility for learning belongs to the student, regardless of age!

















