এক Ahhsome অনুভূতি। যাকে আমি সব চেয়ে বেশি অপছন্দ করতাম আমার জিমে, যাকে দেখলে আমার নিদারুন বিরক্তি লাগত, যার কথা শুনলে মনে হত বিস্বাদ কিছু, যার উপস্থিতি আমাকে প্রচন্ডভাবে ক্লান্তিকর মনে হত, কয়েক মাসের মাথায় সে এখন জিমের অনেকগুলো প্রিয় মুখের মধ্যে একজন। যিনি উঠতে বসতে কষাটে আচরণ করতেন, কটুভাষী বলে এক নামে যাকে সবাই ভয় পায় এবং মাঝে মাঝে এমন বাস্তববাদীদের মত কান্ড করতেন মনে হত কোন মন্ত্রীর বউ এসেছেন! অথচ ধীরে ধীরে তিনি হয়ে গেছেন আমার খুব প্রিয় আন্টি! প্রতিদিন আন্টির সাথে দশ মিনিটের জন্য হলেও আমার কথা বলা চাই। কোন দিন আমি দেরী করে গেলে যেমন আন্টি আমাকে পরদিন খুঁজেন তেমন আমিও আন্টি কে কোন দিন দেখতে না পেলে একটু চিন্তায় পরে যাই।
যে কোন সম্পর্ক আমার কাছে খুব অপার্থিব মনে হয়। এই যেমন চিনি না জানিনা এক ছেলের সাথে কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ প্রেম হয়ে যায়। সেই প্রেম এতটাই গভীরে চলে যায় যে মানুষ তার জন্মদাতাদের পর্যন্ত কষ্ট দিতে একেবারেই ইতস্ততঃ করে না। সব চেয়ে আশ্চর্য লাগে কিভাবে বিয়ের পর মেয়েরা সব সম্পর্ককে একদিকে রেখে একেবারেই অন্য এক পরিবারে যেয়ে, অন্যের বাবা মা কে কত উদ্বেগ এর সাথে আপন করে নেয়! পৃথিবীর যাবতীয় সম্পর্ক আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে। কিভাবে মানুষ প্রতি মুহুর্তে সম্পর্ক তৈরী করে নেয়। প্রতিবেশি, বন্ধুত্ব, সমাজ সব কিছুর সাথে নিজে নিজেই সম্পর্ক গড়ে উঠে। এমনকি জায়গা বা দেশের সাথেও মানুষের এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠে যা একান্তই মনের!
আন্টির সাথে আমার চার মাস আগেও এত কথা হত না। কিন্তু এখন যতক্ষনই আমরা কথা বলি, প্রতিটা কথার মধ্যে থাকে অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা, অর্থপূর্ন কোন বিষয় অথবা প্রয়োজনে বাগবিতণ্ডা করা যায় এমন বিষয়াদী। সব চেয়ে ভাললাগে তখন, যখন আন্টি নিজের সংসারের কিছু মজার কোন বিষয় খুব সুন্দর করে আমার সামনে তুলে ধরে। কখন কাজের মেয়ের অন্যায় তো কখন ড্রাইভাবের নোংরামী তো আবার কখনও কিভাবে তিনি রান্না করলেন এই সব কিছু। ওনার সাথে যত কথা বলি তত মনে হয় মানুষ হিসেবে তিনি খুব নরম ছিলেন এক সময় কিন্তু সময় এবং পরিবেশ ওনাকে বেশ শক্ত বানিয়ে ছেড়েছে! তিনি প্রায়ই আঙ্কেলের বাস্তবানুগ হবার গল্প শোনান। কিভাবে তিনি এমন একজন বাস্তবধর্মী মানুষের মধ্যে সুখ এবং ভালবাসা খুঁজে নিয়েছেন তার গল্প শোনান। প্রায়ই তিনি গল্প করেন ছোট্ট সংসারের কিন্তু কোন দিন বলেননি নিজের সন্তানদের কথা!
একদিন কথা প্রসংগে আমি জিজ্ঞাসা করে ফেলি আন্টির শারীরিক অসুস্থ্যতার কথা। আমি জানিনা আমার জিজ্ঞাসা করা কতটা উচিত ছিল কিন্তু কৌতূহল এতটাই ছিল যে জিজ্ঞাসা না করে থাকতে পারছিলাম না। ইলেকট্রিকাল রাইডার এ চড়তে চড়তেই জীবনের অনেক হৃদয়স্পর্শী আলোচনা চলতে থাকে। ভুলেই যাই কখন ত্রিশ মিনিট পার হয়ে যায়! সব আন্টিরাই দেখি তাদের সন্তানদের নিয়ে, স্বামীদের নিয়ে সারাদিন পার করে দেয় গল্প করতে করতে কিন্তু আমার এই প্রিয় আন্টি কোন দিন বলেনি তার বাচ্চা কাচ্চার গল্প। সেদিন পরোক্ষভাবে জিজ্ঞাসা করে বসি। আর সেইদিন থেকে আন্টির প্রতি কেন যেন আমার এক অন্য রকম মায়া জন্মেছেল। কি ভাবতাম আমি আন্টিকে নিয়ে। তিনি শুধু একবার আমার হাত নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন দেখে কি অপমানটাই না করেছিলাম ঠান্ডা মাথায়! এখন ভাবলেই আমি স্নায়বিক চাপ অনুভব করি। এই মায়া কেমন মায়া তা আমি বোঝাতে পারব না তবে এতটুকু বলতে পারি, মেয়ে হয়ে যেমন মা’র যন্ত্রনা খুব সহজে বুঝতে পারি তেমন নারী হয়ে অন্য নারীর কষ্টটা আমি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারি। বয়স আন্টির মত না হলেও যত দিন ধরে বেঁচে আছি তাতে দুনিয়াটা তো কম দেখিনি। যথেষ্ট দেখেছি। মাঝে মাঝে তো মনে হয়ে একটু বেশিই দেখে ফেলেছি। এতটা না দেখলে বা শুনলেও আমার চলে যেত। আন্টির কোন সন্তান হয়নি। কথাটা বলতে যেয়েই তিনি কেন যেন পুরো বিষয়টা পরিবর্তন করে ফেললেন। আমি কি যেন দেখলাম ওনার চোখে। সাথে সাথে আমিও বলে ফেলি, “সন্তান জন্মানো তো আল্লাহ্’র উপর। তিনি যদি সন্তান না দেন তাহলে আসবে কোথা থেকে আন্টি?” আন্টি আমার কথা শুনে একটু অবাক হয়ে যায়। ওনার মেয়ের বয়সি আমি, সেখানে ওনাকে ধ্র্মোপদেশ দিচ্ছি। আন্টিও হেসে আমাকে বলে, যেভাবেই হোক ত্রিশ বছর হবার সাথে সাথে একটা বাচ্চা নিয়ে নিও। তবে সেখানে আমার একটা কিন্তু ছিল। ত্রিশ বছর কেন? এখন তো অনেক ধরনের পদ্ধতিতে বাচ্চা নেয়া যায়। প্রয়োজনে বাচ্চা দত্তক নেয়া যায়। এখনও কি সে যুগ আছে যেখানে মেয়েদের সন্মান দেয়া হয় তার মাতৃত্বের জন্য? তার মানে কি মার বাচ্চা না হলে আমাকে সমাজের সব চেয়ে জঘন্য স্তরে ফেলা হবে? আর আমি সেটা চুপ করে মেনে নেব?
নারীদের শ্রদ্ধা করা হয় তারা মা হবার ক্ষমতা রাখে বলে? বোন বলে না কেন? ভাবী বলে না কেন? চাচী/মামী বলে না কেন? ফুপি বলে না কেন? কেন একটা মেয়েকে মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য শ্রদ্ধা করা হয়না? আমি নিজেও হয়ত মা হব/হয়ত হব না। আমি কি এখানে বসে এই মুহুর্তে বলতে পারব আমি কাল মা হবই? কোন মেয়ে কি তা বলতে পারে? আমরা কি শুধুই সন্তান জন্মাবার জন্য দুনিয়াতে এসেছি? তাহলে আল্লাহ্ যাদের সন্তান হবার ক্ষমতা দেননি তাদের কে তিনি কেন পাঠিয়েছেন? আমার আসলে এই বিষয়গুলো নিয়ে কোন মহিলা হুজুরের সাথে বসা উচিত। আমার কপালে যদি মা হওয়া না লেখা থাকে তাহলে আমি কোথা থেকে মা হব? সারা জীবন একটা সন্তানের স্বপ্ন দেখলেন কিন্তু হল না , শেষ জীবনে এসে জানতে পারলেন স্বামী একজন ইন্দোনেশিয়ান নার্স কে বিয়ে করেছে সিঙ্গাপুরে তখন আপনার কেমন লাগবে একজন মেয়ে হয়ে? এইভাবেই জীবনটাকে তীলে তীলে শেষ করেছিলেন আমার মা’র বান্ধবী। আমাকে দেখলেই যিনি নিজের সন্তানের মত বুকের মধ্যে আগলে নিতেন। মা’র সেই প্রিয় বান্ধবী, তিনি কি পেরেছিলেন পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে সন্তান জন্ম দিতে? লন্ডন, আমেরিকা, জাপান কোন দেশই তো তিনি বাদ রাখেননি। তার থেকে বড় কথা, শেষ বয়সে এসে যখন জানতে পারেন স্বামীর না বলে দ্বিতীয় বিয়ে তাও আবার সেই হাসপাতালের নার্স এর সাথে যে হাসপাতালে তিনি মা হবার জন্য চিকিৎসা করতে যেতেন সিঙ্গাপুরে, তিনি সহ্য করতে পেরেছিলেন? তার থেকে আঙ্কেল যদি অনুমতি নিয়ে বিয়েটা করতেন তাহলে আন্টি এত কষ্ট পেয়ে মারা যেতেন না। শেষের দিকে তিনি এতটাই মানসিক চাপে পরেছিলেন যে নিজের ঔষধটুকু ঠিক মত খাবার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিভাবে আন্টি পৃথিবীতে থেকে বিদায় নিয়েছে সব দেখেছি নিজের চোখে। মারা যাবার সাত দিন আগেও তিনি মা’কে বলে গিয়েছিলেন, ” আমি ক্ষমা করতে পারব না ওকে, আমাকে ক্ষমা করতে বল না, আমি এত মহান না।”
পৃথিবীতে একটি শিশুকে জন্ম দেয়া বুঝি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার জীবনের থেকে মূল্যবান? সন্তান ছাড়া বুঝি সংসার টেকানো যায়না? এমন অনেক কথা, অনেক বিতর্ক, অনেক যন্ত্রনার বিস্ফোরণ গত কয়েকদিন ধরে হচ্ছে আমার এবং জিমের প্রিয় আন্টির মধ্যে!
আন্টির সাথে কথা বলতে যেয়ে সেই সকল মহিলাদের কথা মনে পরল যাদের আমি ছোটবেলায় অনেক দেখেছি সন্তানের জন্য সংগ্রাম করতে। আমার নিজের চাচী যিনি সন্তান ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করেনি দেখে ধীরে ধীরে বিষন্নতায় আক্রান্ত হল। সেই মন্দা অবস্থা এতটাই গুরুতর হল যে চাচী আমার আত্মহত্যা করে বসে। চাচী কে একদিন মা গাড়িতে জিজ্ঞাসা করছিল, ভাবী আপনি যেই সন্তানদের সুখের কথা ভেবে এত কিছু বিসর্জন দিয়েছেন সেই সন্তানদের রেখে আপনি কেন মরে যাবার কথা বলেন?” চাচী উত্তর দিয়েছিলেন, ” বেঁচে থেকে কোন লাভ নেই। মরে গেলেই ভাল। এই পৃথিবী আমাকে কি দিয়েছে? আমার কারো জন্য মায়া লাগে না।” চাচী, যিনি সারা জীবন নিজের ছেলেদের মানুষ করার পিছনে আপ্রান চেষ্টা করে গেছেন অথচ নিজেকে শুধু শুধুই ব্যার্থ মা ভেবে জীবনটাই দিয়ে দিলেন সেখানে যাদের সন্তান নেই তাদের কি করা উচিত? আন্টিকে অনেক কিছুই বললাম, চাচীর কথা, মা’র মৃত বান্ধবীর কথা, তাকে বললাম তিনি কত ভাল আছেন, কত সুখে আছেন। আর এর সব কিছুর জন্য তিনি বার বার আঙ্কেল কে পরোক্ষভাবে কৃতজ্ঞতা জানালেন। সেই কৃতজ্ঞতার মধ্যে ছিল এক ধরনের আত্মতৃপ্তি। ওনার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে আমার একবারের জন্য মনে হল, সন্তান সন্তান করে যারা দুই/তিনটা বিয়ে করে, তারা কি করে পারে প্রথম স্ত্রীর জীবনে সারাজীবনের জন্য এত গভীর ক্ষত দিতে? সেই সমস্ত পুরুষদের যদি প্রিয় আন্টির মুখটা একবার দেখাতে পারতাম, ভেবে নিতাম কিছু পাপ কমেছে।
একবারও কি কেও ভাবে অন্যের অভিশাপ নিয়ে কখন সুখে থাকা যায়না। অভিশাপ কি সব সময় মানুষ শব্দগতভাবে দেয়? কিছু অভিশাপ তো দীর্ঘশ্বাসে থাকে… যার বহিঃপ্রকাশে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কারো জীবনের চিরন্তন সুখ!
আন্টি, আমি যেখানেই থাকিনা কেন, আপনি যেখানেই যান না কেন, আপনাকে আমার সব সময় মনে থাকবে মা’র সেই বান্ধবীর মত। জিমে হয়ত এক সময় আমার যাওয়া হবে না। আবার হয়ত অন্য কোন জিমে চলে যাব। বিয়ের পর, যেখানে স্বামীর বাসস্থান সেখানেই কোথাও আমার জিম হবে কিন্তু আপনি আমার মনে সব সময় থাকবেন। আপনার সন্তান নেই তো কি হয়েছে, পৃথিবীর যাবতীয় সন্তান সব আপনার।

আমাদের দেওয়ালে এখনও অনেক ছবি শোভা পাচ্ছে মা’র সেই বান্ধবীর তোলা অসাধারণ কিছু ছবি। তিন দিন আগেই এক আত্মীয় কে বলছিলাম ছবিগুলো কে, কবে কোথায় তুলে দিয়েছিল। বলতে যেয়ে মিনিট দুয়েক এর জন্য থমকে যাই। মনে পরে যায় সেই সব দিনের কথা যখন মা’র হাত ধরে আন্টির বাসায় যেয়ে কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজতাম। আন্টি আমাকে বউ সাজিয়ে দিয়েও অনেক ছবি তুলে দিয়েছিলেন। সেই ছবিগুলো এখনও এলবামে আছে। ছবিগুলো আমার সাথে কথা বলে। আমিও অবাক হয়ে নিজের ছোটবেলা দেখি, ভাবি, কেন এত বড় হলাম। কেন এত বড় হলাম মা? কেন আমি ছোটই থেকে গেলাম না?
জীবনটা কত দিনের? একবার কি কেও ভেবে দেখেছে জীবনটা আসলে কতদিনের?
অনেক আবেগপ্রবন হয়ে যাই জীবনের কঠিন হিসাব নিকাশ করতে বসলে। এর থেকে বেশি হলে সমস্যা হবে ঘুমোতে। সবাই ভাল থাকুন, আপনার ঘরের যে কোন নারীকে কাল এক গুচ্ছ ফুল বা কিছু একটা খাবার কিনে এনে চমৎকৃত করুন। আমরা মেয়েরা যতই খারাপ হইনা কেন, শরীরের ভেতরে একটা মন আছে যা কোন ভাবেই আপনার অমঙ্গল চাইতে পারে না। যত কষ্টই দেননা কেন। মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলেই কি এত দ্বন্দ্বযুদ্ধ?
God is near