আমি জীবনেও ভাবিনি কোন দিন মক্কা/মদিনায় যাব। আমি কোন দিনও চিন্তা করিনি একদিন খুব কাছে থেকে আল্লাহ্র ঘর দেখব। দেখে আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পরবে। আমি অবাক দৃষ্টিতে সেই ঘরের দিকে তাকিয়ে ভাবব, “আল্লাহ্ তুমি নিয়ে এসেছ তোমার ঘরে আমাকে, তোমার মেহমান বানিয়ে… এইবার আমার সব পাপ তুমি ক্ষমা কর। মাফ করে দাও আমাকে, সঠিক পথ দেখাও, আল্লাহ্ আমার ইমান কে তুমি আরো মজবুত কর।”
গত বাইশে মার্চ আমি জীবনে প্রথমবারের মত মদিনা শহরে প্রবেশ করি। এয়ারপোর্ট এ ইমিগ্রেশন নিয়ে বিশাল ঝামেলা হয়। দুই জন মাত্র ইমিগ্রেশন অফিসার আর সেখানে শত শত মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগে। এয়ারপোর্ট এর ঝামেলা শেষ করে চলে আসি হোটেল এ। হোটেলে আসার সময় যখন মসজিদ আল নাবায়ির কিছু অংশ দেখতে পেলাম তখন বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা হাহাকার অনুভব করলাল। সত্যি কথা বলতে গেলে এর পর থেকে আমি কেন যেন অনেকটা অনুভূতিশূন্য হয়ে যাই। আমি কিছুই বোধ করছিলাম না। সব কিছুই আমার কাছে স্বপ্নের মত লাগছিল। নিজের কাছেই বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি কিছুক্ষনের মধ্যে আমাদের প্রিয় নবীর সমাধীর কাছে চলে যাব। সেই নবী যাকে আমি জন্মের পর থেকে মন প্রান আত্মা সমস্ত কিছু দিয়ে ভালবাসি, যাকে অনুসরন করি। ভাবতেই আমার মনের মধ্যে একধরনের কম্পন হচ্ছিল। গভীর রাতে হোটেলে যেয়ে ঘুমিয়ে যাই কারন আমাদের ভোর হলেই মসজিদে চলে যেতে হবে। আর তেইশে মার্চ আমার জীবনে নিয়ে আসে এক নতুন অধ্যায়! এমন এক অধ্যায় যা আমার জীবনে সব সময় স্বর্ণসমৃদ্ধ হয়ে থাকবে।
প্রথম জামাতঃ আমার জীবনের প্রথম জামাত মসজিদ আল নাবায়িতে। যে মসজিদ বানিয়েছিলেন নবীজি। এত বড় কোন মসজিদে আমি আগে কখন জামাত পড়িনি। আমি জানিওনা কিভাবে এত মানুষের মাঝে জামাত পড়তে হয়। এই জামাতগুলো আমাদের দেশের মসজিদের মত না। জুম্মার দিন, প্রচন্ড ভিড়। ভিড়ের মাঝেই সবাই এক সাড়িতে বসে নামাজ পড়ে। কত দেশের মানুষ সেখানে। কত রকম জাতি। অথচ সবার গন্তব্য একটাই! আল্লাহ্কে পাওয়া। আল্লাহ্ দরবারে নিজের সকল পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া। কেও কাওকে চিনে না জানেনা, অথচ সবাই সবার জন্য! প্রথমবার জামাত পড়ার পর মনে হল, আমার কিছুটা হলেও পাপ মুক্ত হয়েছে। এর পর আসে নবীজির কবর জিয়ারাহ এর পালা। রিয়াদুল জান্নাহ তে প্রবেশ করার সময় অনেক সমস্যায় পরতে হয়েছে। ধাক্কাধাক্কি এবং প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে একবার মনে হল বসে কাঁদি! ব্যাথাও পেয়েছি পায়ে অনেক। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। এইভাবে চলে প্রতিদিন। হাজার হাজার মানুষ এইভাবেই আঘাত পেয়ে শান্তি পাচ্ছে। সেখানে কিছু রাকাত নামাজ পড়লাম। আল্লাহ্র কাছে অনেক কিছু দোয়ার মাধ্যমে চাইলাম। আমার এখনও চোখে ভাসে মসজিদের ছাতা। দিনের বেলা খুলে যায়, রাতের আঁধারে সবগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কি সুন্দর সেই পরিবেশ!
কুবা এবং আল কিবলাতাইন মসজিদঃ মদিনাতে আছে বেশ কিছু প্রসিদ্ধ মসজিদ আছে। মোটামোটি সবগুলো দেখেছি। নামাজও পড়ার সুজোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ্! কুবা মসজিদ আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল আরো কিছুক্ষন নামাজ পরব সেখানে কিন্তু সময়ের এত অভাব ছিল যে আমরা পারিনি। কুবা মসজিদ এ প্রবেশ করে নামাজ এবং কিছু নফল নামাজ পড়ি। কুবা মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়লে তা এক ওমরা হজ্জ এর সমান সোওয়াব পাওয়া যায়। কুবা মসজিদের পরিবেশ এত বেশি শান্তিপ্রবন ছিল যে সেখান থেকে আর আসতে ইচ্ছা করছিল না। মনে হচ্ছিল এখানেই যদি থেকে যেতে পারতাম সারাটা জীবন। মানুষ কম, যে যার নিজের মত নামাজ পড়ছিল আর তার থেকেও বড় কথা, মসজিদে প্রবেশের সাথে সাথে এমন যেন এক প্রশান্তির হাওয়া অনুভব করেছিলাম। এমন পরিবেশ কম মসজিদেই আছে। সত্যি কথা বলতে আমাদের পরিবেশ আমাদের ধার্মিক হতে অনেকটা সাহায্য করে। যখন সবাই মিলে দল মিলে নামাজ পড়ে, যখন সবাই আজান দেবার সাথে সাথে একসাথে সমবেত হয় সেখানে বাস করলে মানুষ প্রকৃত অর্থে ধর্মের প্রতি মনযোগী হতে বাধ্য! এমনকি কিবলাতাইন মসজিদে যখন মাগরিবের নামাজ পড়ছিলাম, তখনও আমার তাই মনে হয়েছিল। আরো গিয়েছিলাম উহুদ এর পাহাড় দেখতে। সেখানে সমাধি রয়েছে ৭০জন সাহাবীর। সেখানেও দোয়া করেছি কিছুক্ষন আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলে। ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, মদিনায় কেন আমার জন্ম হল না?
মক্কা, আল্লাহ্র ঘরঃ আরেকবার আমি আবেগআপ্লুত হয়ে যাই মক্কা শহরে প্রবেশের সময়। জম জম টাওয়ার এর ঘড়িটা দেখার সাথে সাথে বুকের ভেতরাটা কেমন যেন মোচড় দিল। যেই কাবা ঘর জায়নামাজে দেখি, যেই কাবা ঘরকে চিন্তা করে নামাজ পড়ি, যেই কাবা ঘরকে আমি এত দেখি টেলিভিশন এ সেই কাবা ঘরকে নিজের চোখের সামনে দেখে আরেকবার নিরাবেগ হয়ে যাই। মাতাফ এ প্রবেশ এর সাথে সাথে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি আল্লাহ্র ঘরের দিকে। মদিনা থেকে মক্কা গিয়েছিলাম গাড়িতে। প্রায় ছয় ঘন্টার যাত্রা শেষ করে মক্কা শহরে এসে খুঁজতে থাকি হোটেল। কিছু হোটেল ভেঙ্গে ফেলার কারনে অনেক সমস্যায় পরতে হয় আমাদের। প্রায় এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে হোটে্লের ব্যাবস্থা করি। এর পরেই হোটেলে যেয়ে প্রস্তুতি নেই ওমরার। রাত তখন প্রায় এগারটা। যাবার সময় তিন জন স্যান্ডউইচ খেলাম রাস্তার দোকানগুলো থেকে। এর পরেই চলে যাই হারাম শরিফ এ। মাতাফে নেমে তাওয়াফ করি। এর পর চলে যাই সাই করতে। অনেকটা চ্যাপ্টা হয়ে যাই তাওয়ফ করার সময় কিন্তু কেন যেন মনের মধ্যে ছিল প্রচন্ড আনন্দ। আমি ওমরা হজ্জ করছি, তাও আবার জীবনে প্রথমবার। এই আনন্দ কেমন আনন্দতা এখানে লিখে বোঝানো যাবে না। সাফা মারওয়া পাহাড়ে হাঁটার সময় প্রথম তিন দফা কষ্ট হয়নি কিন্তু এর পর থেকে আর কিছুতেই পা আগাচ্ছিল না। হয়ত অনেক রাত অথবা দিনের বেলার ক্লান্তি সব মিলিয়ে শরীর পারছিল না আর নিতে। বেশ কয়েকবার মাথায় এবং পায়ে জম জমের পানি দেই। নিজেকে অনেক ভাবে বোঝাই, আমি পৃথিবীর সব চেয়ে সর্বোত্তম স্থানে আছি। এখানে যদি আমি মারাও যাই, আমার কোন আফসোস থাকবে না। এই ভাবতে ভাবতে আমি আবারও শুরু করি হাঁটা। এইভাবে সাই করা শেষ করে বাবা গেল চুল কেঁটে ফেলতে। আমরা হোটেলে এসে চুল কাটলাম। এইভাবেই শেষ করলাম ওমরা। এর পর প্রায় প্রতিদিনই আমি তাওয়াফ করেছি। ফযরের ওয়াক্ত এর নামাজ শেষ করেই আমরা নেমে যেতাম তাওয়ায়ফ করতে। যখনই সুজোগ পেয়েছি তখনই তাওয়াফ করেছি! সাথে নামাজ তো আছেই। ইমাম সাহেবের গলায় কি আছে আমি জানিনা, আমি ঢাকায় ফেরার পরও সেই কন্ঠস্বর স্বষ্ট শুনতে পাই। কি মিষ্টি সেই আজান, কি অদ্ভুত মায়া সেই স্বরে। জীবনটাই সম্পূর্ন মনে হয়! আমি আবারও যাবে মক্কায়, যাব মাতাফে … আল্লাহ্র ঘরের কাছে আবারও আমি মাঝ রাতে বসে থাকব আর দোয়া করব জীবনের সব ভুল ত্রুটিকে ক্ষমা করে দেবার দোয়া…

কোন রকম সম্পাদনা ছাড়া ছবিটি পোস্ট করলাম। তুলেছিলাম হারাম শরিফের ফাহদ গেইট দিয়ে প্রবেশ করে দো’তালা থেকে।
ফিরে আসাঃ মদিনা থেকে ফেরার দিন যেমন দুই চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল ঝরেছিল, বার বার যেমন নবীজির মসজিদের দিকে চোখ গিয়েছিল, তেমন মক্কা থেকে জেদ্দা যাবার সময়ও মনে হয়েছে, কেন আমি আরও কিছু দিন থাকতে পারলাম না। কি আছে হারাম শরিফে? জানিনা কিসের এত মায়া, জানিনা কিসের এত ব্যাথা আমি হৃদয়ে অনুভব করেছি। মনে হচ্ছিল আমার চোখের সামনে থেকে আমার সব চেয়ে প্রিয় কিছু কেও কেড়ে নিচ্ছে অথচ আমি মুখ খুলে কাওকে কিছু বলতে পারছিনা, বলতে পারছিনা নিও না, নিও না!! বিদায় তাওয়াফ এর পর আর হারাম শরিফে প্রবেশ করা যায়না। শেষ বার যখন হারাম শরিফ থেকে বের হচ্ছি তখন অপলক দৃষ্টিতে আমি চেয়ে ছিলাম আল্লাহ্র ঘরের দিকে। কি অদ্ভুত সেই কালো কাপড়ে মোড়ানো ঘরটা! একজন ভদ্রলোক অনেক শব্দ করে কাঁদছিল, তার দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে ছিলাম। আমিও যদি তার মত শব্দ করে কাঁদতে পারতাম !! কেমন যেন একটা মায়া জড়িয়ে গিয়েছিল হারাম শরিফ এর সাথে। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা তারপরো ছুটে চলা আজানের সাথে সাথে। হাঁটুর ব্যাথায় ঠিক করে নামাজ পড়তে পারছিলাম না তারপরও মনে হচ্ছিল, জীবনে এর থেকে সর্বোৎকৃষ্ট সময় আর হতে পারে। একদিকে আল্লাহ্র ঘর, অন্যদিকে জীবনের সব যন্ত্রনা ভুলে যেয়ে এক শান্তির চতুর্পাশ্ব!
এখন শুধু অপেক্ষা হজ্জ এর। এই বছর না হলে আগামী বছর ইচ্ছা আছে হজ্জ করবার। জীবনে একবার হজ্জ ফরজ, আমি মনে করি বয়স থাকতেই আমার হজ্জ করে ফেলা উচিত। যত বয়স বাড়বে, হজ্জ এর জন্য শরীর তত বেশি বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এখন শরীর অনেক ক্লান্তি বহন করতে পারে কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের পর শরীর আর নিতে পারবে না। তখন হাজার টাকা পয়সা থাকলেও যেতে পারবে না নিজের শরীরের জন্য। এখন সুস্থ্য আছি, এই পুন্যের কাজটা করে ফেলি।
আমি আবারও আসব ডেসার্ট সাফারি এবং আমার প্রিয় কিছু স্মৃতির সম্ভার নিয়ে। Till then সবাই খুব হাসি খুশি থাকুন এবং প্রচুর পরিমানে পানি পান করুন। গরম যেইভাবে পরেছে তাতে শরীরে পানির ঘাটতি হয়ে যাবে। যখনই মনে পরবে, পানি পান করবেন।