আমার জীবনের রুপকথা এখন অনেকটা এক ঘেয়ে বকবকানিতে ক্লান্ত করে তোলার মত অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। আমি জীবনে এমন কিছু কাজ করে যাচ্ছি যাতে আমার এবং আমার মনের কোন সমর্থন নেই। মাঝে মাঝে আপনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকেন যাতে আপনার নিজের মনের কোন অনুমোদন না থাকলেও আপনাকে পরিবার বা সমাজের কারনে নিতে বাধ্য হতে হয়! আমার ক্ষেত্রে দুটোই প্রযোজ্য! মাঝে মাঝে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দিনটাকে খুব কষাটে মনে হয়! সূর্যের তাপ, ঘন ঘন নিজের জিনিস পত্র নিতে ভুলে যাওয়া, জীবনে একের পর এক বৈরী মতামত নেয়া সব মিলিয়ে মাঝে মাঝে এত ক্লান্ত লাগে যে ইচ্ছা করে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে। যেখানে কেও আমাকে খুঁজে পাবে না! কিন্তু আমি জানি আমি আমার ঘর ছেড়ে দুই দিনের বেশি থাকতে পারিনা। বিশেষ করে আমার মা’র হাতের চা ছেড়ে তো কোথাও যাবার প্রশ্নই উঠে না!!
আপনার কি মনে হচ্ছে আমি বিষন্নতায় আক্রান্ত? যদি মনে হয়ে থাকে তাহলে একদম ঠিক মনে হচ্ছে ! তবে এই বিষন্নতা স্বাভাবিক বিষন্নতা। এখানে গুরতর কোন বিষাদ নয়। এই বিষন্নতা আমার জীবনকে ঘিরেও নয়! আমার এই খেদ এর কারন একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ এবং আমার খুব প্রিয় কাজের বুয়ার ক্যান্সার!
যতবার আমার পরিবার থেকে কেও মক্কা গিয়েছে, ততবার ফিরে আসার পর আমি বংশের কার মৃত্যুর খবর পেয়েছি। প্রথমবার বাবা মা যেবার হজ্জ এ গিয়েছিল সেইবার আমার আপন চাচাত বোনের স্বামী দুটো কিডনি ফেইল করে আকস্মিক ভাবে মারা যায়! গত বছর বাবা যখন হজ্জ এ তখন আমার ছোটফুপা মারা যান! এইবার আমি যখন ওমরা করে ফিরলাম, পেলাম আরেক চাচাত বোনের স্বামীর মৃত্যুর খবর। দুলাভাইকে সেই ছোট্টবেলা থেকে দেখে বড় হয়েছি। খুব ভাল সম্পর্ক ছিল আমার সাথে। আমি যখনই বোনের বাসায় যেতাম, উনি আমাকে কি কিনে খাওয়াবেন থেকে শুরু করে কখনই খালি হাতে ফিরতে দিতেন না। কখন উপহার তো কখন টাকা! মাঝে অনেক দিন যোগাযোগ ছিল না আমার বিদেশে থাকার সময়। ফিরে এসে মাত্র একবার দেখা হয়েছিল। আমার ছোট ভাইয়ার বিয়ের সময়! সেই শেষ দেখা। এইবার ওমরা থেকে ফিরে এসে শুনি দুলাভাই হার্ট এটাক করে মারা গেছেন। তার থেকেও যা খারাপ লেগেছে তা হচ্ছে আমার বোনের মেয়ে এইবার HSC পরীক্ষা দিচ্ছে। উনি মারা গেছেন দ্বিতীয় পরীক্ষার দিন। কেমন করে পরীক্ষা দিচ্ছে আমার ভাগ্নি আমি বলতে পারব না। দুলাভাইকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার গ্রামের বাড়িতে। আমার বোন এবং তার বাকি সন্তানেরাও মা’র সাথে। আর আমার ভাগ্নিটা এক আত্মীয়র বাসায় থেকে পরীক্ষা দিচ্ছে। কেন যেন নিজের HSC পরীক্ষার কথা মনে পরে গেল। সেই সময় আমাদের উপর দিয়েও গিয়েছিল এক বিশাল ঝড়! তবে এতটা ভয়ঙ্কর না!
আমি আগেও বলেছি আমার ব্লগ এ কোন দুঃখের বিষয় নিয়ে আমি লিখতে চাইনা! জীবনের ahhsome ব্যাপারগুলোই শুধু জায়গা পাবে আমার এই ছোট্ট দুনিয়ায়! উপরের এই বিষয়গুলো লেখার পিছনে যা কারন এইবার তা বলি!
আমার প্রিয় কাজের বুয়া সুমনের মা ( যে অনেক বিপদে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল) হঠাৎ করে প্রচন্ড অসুস্থ্য হয়ে যায়। সুমনের মা আমার প্রিয় তার একটা কারন, সে যখন ঘর মুছে, এর পর সেই ঘরের মেঝেতে আপনি আপনার চেহরা দেখতে পারবেন। এতটাই পরিষ্কার হয় তার মোছা! সে মাত্র এক মাসের মধ্যে আমার ওয়াশরুম কে পুরো প্রাসাদ বানিয়ে ফেলেছিল। আমি সব সময় তার কথা এই একমাত্র কারনে স্মরণ করি! কিন্তু ফাঁকিবাজির কারনে মা তাকে কাজ থেকে বিতারিত করেছিল গত বছর। তারপরও সে সম্পর্ক রেখেছিল। প্রতি ঈদে সুমনের মা’র জন্য থাকে লাল শাড়ি। প্রতিবারই শাড়ি নিয়ে সে পায়ে সালাম করে একাকার করে ফেলে। ঈদের দিন সুমন কে নিয়ে এসে বিশাল কান্ড হয় বাড়িতে! ঈদের দিন ওর সাজ দেখে আমিও না হেসে পারতাম না। সেই সুমনের মা’র কেন যেন গত কয়েক মাস ধরে খুব শরীর অসুস্থ্য! মা মাঝে মাঝে ওকে ফোন দিলে সে কথাই বলতে পারেনা। খুব কষ্ট হয় তার কথা বলতে। আস্তে আস্তে সব কাজ চলে গেছে তার অসুস্থ্যতার জন্য! এরই মধ্যে শুনলাম তাকে সমস্ত পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে এবং রিপোর্ট এ তার throat cancer ধরা পরেছে ! তাকে নাকি অপারেশন করতে বলেছে ডাক্তার। তার জন্য দরকার কয়েক লক্ষ টাকা। শুনার পর থেকে আমার মনটা কেন যেন খুব অস্থির লাগছিল। একটা অল্প বয়সি মহিলা, ছোট ছোট বাচ্চার মা, তার ক্যান্সার? সে বাঁচবেনা? বিষয়টা আমার কিছুতেই হজম হয়না।

আমার মা এইদিকে সমানে তার জন্য সাহায্য তুলতে থাকে। যার যা সামর্থ্য সেই অনুযায়ী সবার কাছে টাকা চায় মা! যে আমাদের বিপদে এগিয়ে আসে সব সময় তাকে সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য বলে মনে করি। আমার সব খালারা যে যত পেরেছে দিয়েছে। মা নিজের কাছ থেকে দিয়েছে। তার জন্য আরো অনেক যাকাতের টাকা তোলার পরিকল্পনা আছে আমাদের। আমরা চাই কোন ভাবেই সে যেন বিনা চিকিৎসায় না মারা যায়। চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ যেন তার হাতে থাকে। ওমরা থেকে আসার পর এমনিতেই আমি অনেক বেশি আবেগপ্রবন হয়ে গেছি। খুব ছোট ছোট বিষয় আমাকে নাড়া দিচ্ছে সেখানে এত বড় একটা ঘটনা আমাকে কতটা বেদনা দিচ্ছে একবার যদি কাওকে বোঝাতে পারতাম ! সুমনের মা গত সপ্তাহে এসেছিল আমার বাসায়! তার হাতে নিজের অর্থ তুলে দেই। পরিমান সামান্য হলেও নিজের টাকা দেবার যেই আনন্দ তা অন্য কিছুতে নেই। একজন সত্যিকারের দুঃখীর হাতে সামান্য কিছু অর্থ তুলে দেবার মধ্যে এত পরম সুখ তা আমি আগে কখনও বুঝিনি। আমি যখন আমার পার্স থেকে টাকা বের করে দিচ্ছি, কি অদ্ভুতভাবে মেয়েটা কাঁদল। চোখের পানি মুছতে মুছতে সে বলল, আপনারা আমার জন্য এত কিছু করলেন, কি করে আমি আপনাদের এই ঋন শোধ করব? কথা বলতে যেয়ে তার গলা ধরে আসল। আমি সাথে সাথে তাকে থামালাম। বললাম, রোজার দিনে তুমি অবশ্যই আসবে। ফোন তো আছেই, প্রয়োজনে ফোন করবে। আমরা তো করবই কিন্তু তোমার দরকার হলেও তুমি করবে!
আস্তে আস্তে লিফট এর দিকে চলে গেল। আমিও ঘরের দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষন থম মেরে বসে থাকলাম। মানুষের জীবন দুই দিনের। কিন্তু আপনি যখন জানতে পারেন আপনি আসলেও দুই দিন পর মারা যাবেন, সেই জীবনটা তখন কেমন লাগে? হঠাৎ মৃত্যু আর আমি যদি জানতে পারি আমার মৃত্যু কাল অবধারিত, সেই মুহুর্তে কেমন লাগবে আমার? এই ভাবতে থাকি আমি সারাদিন। এমনও তো হতে পারে রোজার আগেই সুমনের মা মারা গেল? আবার এমনও তো হতে আগামী পাঁচ বছর সুমনের মা বেঁচে থাকল? জানিনা তার সাথে কি হবে কিন্তু টাকা হাতে নেবার পর তার চোখ দিয়ে যে টপ টপ করে পানি ঝরছিল তা দেখে আমি কেমন যেন এক ধরনের শান্তি অনুভব করি। তাতে আমি ভুলে যাই বংশের বেশ কিছু মৃত্যুর কথা! ফুপা মারা যাবার সময় আমি যেতে পারিনি। ভেবেছিলাম ফুপা তো আছেনই, মা’কে পাঠিয়েছিলাম। মা গিয়েছিল টাকা নিয়ে ফুপার কাছে। আমি মা’কে বলেছিলাম আরো কিছু টাকা নাও। চিকিৎসা কি ফুপু একা চালাতে পারবে? মা দেখে আসল আর সেই রাতেই ফুপা মারা গেল হাসপাতালে। রাত দুটোর সময় মা ঘরে জানিয়ে গেল ফুপার মৃত্যুর কথা। সেই রাতে মা ঘুমোতে পারেনি। আর আমি? কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি কেন ফুপাকে অবহেলা করে দেখতে গেলাম না? জীবনে কি আর কোন দিনও পাব ফুপাকে দেখতে? কেন গেলাম না আমি? এই ভেবেই অনেক দিন আমি পার করেছি। কিন্তু সুমনের মা’কে সাহায্য করার পর থেকে মনে মনে এক অনুকম্পা, না আমি তাকে শেষবারের মত দেখলাম, সাহায্যও করলাম। এখন সে মারা গেলেও আমার কোন দুঃখ থাকবে না!
আল্লাহ্ আমাকে অনেক দিয়েছেন। কথাটা আমি সব সময় স্মরণ করি এবং আল্লাহ কে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। আরো অনেকের মত গুচি, প্রাডা ব্যাগ নিয়ে আমি ঘুরে না বেড়াতে পারি, আমার বাসায় নতুন লেক্সাস গাড়ি নাও থাকতে পারে, গুলশানের লেইক এর পাড়ে আমার বিশাল মাপের রাজপ্রাসাদ নাও থাকতে পারে কিন্তু আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছে। দিয়েছে একটা বড় মন, সুশিক্ষিত পরিবারে জন্ম, ধর্মের প্রতি মন আছে এমন বাবা মা, ঢাকা শহরের ভাল কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে সমাজের যোগ্য করে তোলার জন্য ভাগ্য! আল্লাহ আমাকে অনেকে দিয়েছে, দিয়েছে দুটো চোখ, দুটো করে হাত পা এমন মস্ত বড় একটা মন যা পৃথিবীর অর্থেক জিনিস কে ভালবাসতে জানে। তাই আমার এই অনেক কিছুর সামান্য যদি অন্যের কাজে আসে তাকে আমি কি বলব? সাহায্য? সহানুভূতি নাকি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ? এখন আপনি আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন, কাজের মেয়েকে কেন আমি ভালবাসতে যাব? এর উত্তর হবে একটাই, “ভালবাসা মন থেকে আসে, কারো শরীরের গন্ধ শুঁকে না” ! অর্থ দিয়ে যদি পৃথিবী জয় করা যেত তাহলে আমাকেই জয় করে নিত এই আস্ত পৃথিবী!
মাঝে মাঝে আপনিও সাহায্য করুন! অর্থ দিয়ে, পুরনো কাপড় দিয়ে, এমনকি আপনার ফেলে দেয়া এক আস্তরণও কাজে লাগতে পারে কোন দারিদ্রপীড়িত শিশুর। বিশ্বাস করুন, কাওকে দিলে আপনার কমবে না, বাড়বে। আমার বাবা মা সারাক্ষন এই কথা বলে। এই কারনেই হয়ত অনেক অভাবেও আমরা অভাব কি বুঝতে পারিনা। কেও নিশ্চয় দোয়া করেছিল বলেই আজ এই অবস্থানে আসতে পেরেছি! হতে পারে কারো চোখের পানি আমার মঙ্গল নিয়ে আসে?
অনেক বড় একটা পোস্ট! বুঝতে পারলাম না আমার লেখার বিষয়টা কি! প্রথমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করলাম, পরে সুখ! জানিনা পোস্ট এর টাইটেল এর সাথে লেখার কোন মিল আছে কিনা! যদি মিল খুঁজে পান আমাকে অবশ্যই জানাবেন। Till then সবাই খুব ভাল থাকুন এবং আপনার আশে পাশের গরীবদের মনটা বড় করে দান করুন। লোক দেখানো দান এবং সত্যিকার অর্থে সাহায্য করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে! কথাটা সব সময় মনে রেখে দান করবেন।
Allah is near